সত্তরের দশকে নাসরের এ গ্রন্থটি এক অর্থে বস্তুবাদী পশ্চিমা সভ্যতার বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি ও বিজ্ঞান দর্শনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। গুরুত্বপূর্ণ এ গ্রন্থটি এককথায় মেটাফিজিক্স এবং পাশ্চাত্যের তৈরিকৃত বস্তুবাদী জগতে মেটাফিজিক্সের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব তার উপর লিখিত। নাসর দেখিয়েছেন, মেটাফিজিক্স ও আখলাক থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে পাশ্চাত্য যে কথিত আধুনিকতা তৈরি করেছে, তার বাইপ্রোডাক্ট হলো 'আধুনিক মানুষ' যারা কিনা জীবনের সকল ক্ষেত্রে ভয়াবহ আধ্যাত্মিক শূন্যতা ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনতার সংকটে বিপর্যস্ত ও জর্জরিত।
নাসর বলতে চেয়েছেন, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে উদ্ভূত নাস্তিকতা, অজ্ঞেয়বাদ কিংবা অধুনা মানুষের ভয়াবহ আধ্যাত্মিক শূন্যতা স্রেফ প্রযুক্তি কিংবা যান্ত্রিক জীবনযাপনের ফলাফল নয়। বরং, পাশ্চাত্য মহাবিশ্বকে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি এবং দার্শনিক চোখ তৈরি করেছে, এগুলো তারই ফলাফল মাত্র। ফলত, নাসর এককথায় আজকের দুনিয়ার সংকটের একধরনের গভীর পাঠের ভেতর দিয়ে গেছেন, যেখানে তিনি কেবল সংকট নিয়ে আলোচনা করেই ক্ষান্ত থাকেননি, বরং সংকট উদ্ভূত হওয়ার কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন।
উত্তর আধুনিক সময়ে এসে পাশ্চাত্যের প্রস্তাবিত সমাধানসমূহ যখন প্রমাণিত হয়েছে অযৌক্তিক ভ্রমে, পাশ্চাত্যের বিশ্বব্যবস্থা যখন মানুষকে তার ন্যূনতম অধিকারের পরিবর্তে কায়েম করেছে নব্য আধিপত্য ও শোষণমূলক ব্যবস্থা, মানুষের ভেতরকে অন্তসারশূন্য করে মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে যন্ত্রের মতো- তখন এই গ্রন্থটির প্রয়োজনীয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। নাসরের ক্ষুরধার আলোচনা ও দার্শনিক উপলব্ধি এবং অনুবাদকের পরিশ্রমের মিশেল গ্রন্থটির বঙ্গানুবাদকে সুখপাঠ্য করেছে।